
একসময় কেনাকাটা, আড্ডা আর অবসর কাটানোর অন্যতম গন্তব্য ছিল রাজধানী ঢাকার শপিং কমপ্লেক্সগুলো। উৎসব-পার্বণ কিংবা সাপ্তাহিক ছুটিতে এসব বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। কোথাও ক্রেতার উপস্থিতি কমছে, কোথাও দোকান বন্ধ থাকছে, আবার কোথাও ব্যবসায়ীরা টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠছে ঢাকার শপিং কমপ্লেক্সগুলো কি ক্রেতার অভাবে সংকটে পড়ছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কিছু কারণ?
অনলাইন কেনাকাটায় বদলে যাচ্ছে বাজার
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অনলাইন কেনাকাটা এখন অনেকের কাছে জনপ্রিয় বিকল্প। ফেসবুক পেজ, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন অনলাইন শপ থেকে ঘরে বসেই পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতারা। এতে অনেক ক্রেতার শারীরিকভাবে বিপণিবিতানে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে।
অনলাইনে পণ্যের দাম তুলনা করা, ছাড় পাওয়া এবং বাসায় বসে পণ্য হাতে পাওয়ার সুবিধা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে, প্রচলিত দোকানগুলোকে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। ফলে অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেক দোকানকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
দোকানভাড়া ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ
ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন ও পণ্যের পরিবহন খরচ ব্যবসায়ীদের নিয়মিত ব্যয়ের বড় অংশ। বিক্রি কমে গেলে এসব ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘদিন লোকসান বহন করা কঠিন। প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় কেউ ব্যবসার পরিসর ছোট করছেন, কেউ দোকান ছেড়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় ঝুঁকছেন।
তবে সব শপিং কমপ্লেক্সের পরিস্থিতি এক নয়। অবস্থান, পণ্যের ধরন, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে একেকটি বিপণিবিতানের ব্যবসায়িক অবস্থা ভিন্ন হতে পারে।
ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কি কমেছে?
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয়, বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর অনেক পরিবারের হাতে ঐচ্ছিক কেনাকাটার জন্য আগের তুলনায় কম অর্থ থাকতে পারে। ফলে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও শৌখিন পণ্যের মতো খাতে ক্রেতারা ব্যয় কমানো কিংবা কেনাকাটা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এ ছাড়া পণ্যের দাম ও মানের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ক্রেতারা বিকল্প দোকান বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাই বিপণিবিতানে ক্রেতার উপস্থিতি কমার পেছনে শুধু মানুষের অভাব নয়, কেনাকাটার ধরন ও বাজেটের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিরাপত্তা, যাতায়াত ও পার্কিংয়ের প্রভাব
ঢাকার যানজট, পার্কিংয়ের অসুবিধা, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় এবং কোনো কোনো এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি বিপণিবিতানে সহজে পৌঁছানো, স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করা এবং তুলনামূলক ভালো পরিবেশ পাওয়া ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক শপিং মলগুলোতে খাবারের দোকান, বিনোদন, শিশুদের জন্য ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সেবা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পারে। বিপরীতে, এসব সুবিধার ঘাটতি থাকলে পুরোনো বিপণিবিতানগুলোর ক্রেতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
তাহলে কি শপিং কমপ্লেক্সের যুগ শেষ?
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও নির্ভরযোগ্য বাজারতথ্য ছাড়া ঢাকার সব শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কোনো কোনো বিপণিবিতানে দোকান বন্ধ থাকা বা ক্রেতা কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গেলেও তা পুরো খাতের অবস্থা প্রমাণ করে না।
বরং পরিবর্তিত বাজারব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দোকানগুলো অনলাইন ও অফলাইন বিক্রির সমন্বয়, মানসম্মত পণ্য, প্রতিযোগিতামূলক দাম, ভালো গ্রাহকসেবা এবং ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে বিপণিবিতান কর্তৃপক্ষেরও ভাড়া ও সার্ভিস চার্জের যৌক্তিকতা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পার্কিং এবং সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ক্রেতা নেই, নাকি বদলে গেছে কেনাকাটার অভ্যাস?
ঢাকার শপিং কমপ্লেক্সগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদা কতটা বুঝতে পারছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো, তার ওপর। শুধু দোকান খুলে রাখলেই ক্রেতা আসবেন; এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, দাম, কেনাকাটার স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সমন্বয় জরুরি।
তাই প্রশ্নটি কেবল ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ার নয়; বরং কেন ক্রেতারা আগের মতো বিপণিবিতানমুখী হচ্ছেন না, সেটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন। সঠিক পরিসংখ্যান, ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা ও ক্রেতাদের মতামত বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে ঢাকার শপিং কমপ্লেক্স সংকট সাময়িক, নাকি এটি বাজারব্যবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।









































